ডিজনির শতবর্ষের রেকর্ড আয়ের নেপথ্যে থিম পার্ক

ওয়াল্ট ডিজনির শতবর্ষের দীর্ঘ পথচলায় বিনোদনের ধরন অনেক বদলেছে।

ওয়াল্ট ডিজনির শতবর্ষের দীর্ঘ পথচলায় বিনোদনের ধরন অনেক বদলেছে। এক সময় সিনেমার রুপালি পর্দা মূল পরিচিতি হলেও এখন ডিজনির সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে থিম পার্ক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির এক্সপেরিয়েন্স বিভাগ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ডিজনির ১০০ বছরের ইতিহাসে এ প্রথম পার্ক ও অভিজ্ঞতা বিভাগ থেকে মাত্র তিন মাসে ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি আয় হয়েছে।

মূল চালিকাশক্তি

ডিজনির সামগ্রিক ব্যবসায়িক কাঠামোয় থিম পার্ক বিভাগটি এখন সবচেয়ে লাভজনক অংশে পরিণত হয়েছে। ডিজনির সোমবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তিন মাসে বিভাগটি থেকে ডিজনির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। ডিজনির মোট আয়ের মাত্র ৩৮ শতাংশ এ বিভাগ থেকে এলেও কোম্পানির সামগ্রিক পরিচালন মুনাফার প্রায় ৭১ শতাংশই এসেছে এখান থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে এ খাতের এমন দ্রুত প্রবৃদ্ধি পুরো বিনোদন জগতের জন্য একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। থিম পার্ক বিভাগের অভাবনীয় এ আয়ের সক্ষমতাকে অনেক বিশ্লেষক ডিজনির ‘মানি মেকিং মেশিন’ বা অর্থ উপার্জনের মূল যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কৌশলী বিনিয়োগ ও জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি

ডিজনির এ রেকর্ড আয়ের পেছনে রয়েছে সিইও বব আইগারের সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক কৌশল। তিনি পিক্সার, মার্ভেল, লুকাসফিল্ম ও টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের মতো বড় স্টুডিওগুলো অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এর সুফল বর্তমানে পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব স্টুডিওর জনপ্রিয় সিনেমা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (আইপি) এখন থিম পার্কগুলোর আয়ের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অ্যাভাটার, স্টার ওয়ারস, ফ্রোজেন কিংবা কারস সিনেমার জনপ্রিয় চরিত্র ও জগৎগুলোকে কেন্দ্র করে পার্কে নতুন সব রাইড ও দর্শনীয় এলাকা তৈরি করা হয়েছে। পর্দার প্রিয় জগৎ সরাসরি দেখার টানেই লাখো পর্যটক পার্কে ভিড় করছেন। এ ধারা বজায় রাখতে ডিজনি আগামী ১০ বছরে ৬ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় প্রতিটি পার্কে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন সব আকর্ষণ যুক্ত করা হবে।

নেতৃত্বের উত্তরাধিকার ও পার্কের সাফল্য

ডিজনির এ ব্যবসায়িক সাফল্য এখন প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের গতিপথও নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বব আইগারের উত্তরসূরি হিসেবে কে আসবেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছে। তবে পার্ক বিভাগের অভাবনীয় সাফল্যের পর এর প্রধান জশ ডি’আমারোর নাম এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। ডিজনির বোর্ড চলতি সপ্তাহেই নতুন সিইও নিয়ে ভোটাভুটি করতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, স্ট্রিমিং বা সিনেমার চেয়ে এখন পার্ক বিভাগের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকেই নেতৃত্বে আনতে বেশি আগ্রহী ডিজনির নীতিনির্ধারকরা।

বৈশ্বিক বিস্তার ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে কিছুটা মন্দা ভাব থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজনির ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বেশ শক্তিশালী। বিশেষ করে চীনের সাংহাই ডিজনিল্যান্ডে পর্যটকদের রেকর্ড উপস্থিতি এবং প্যারিসে নতুন ‘ওয়ার্ল্ড অব ফ্রোজেন’ খোলার প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক আয় ৭ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নতুন পার্ক নির্মাণ এবং এশিয়ায় নতুন ক্রুজ শিপ চালুর মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করছে ডিজনি। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যাতায়াত খরচ বাড়ার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও নিজস্ব জনপ্রিয় সিনেমাগুলোর ব্র্যান্ড ভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে মুনাফার ধারা ধরে রাখতে আত্মবিশ্বাসী ডিজনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজনির শতবর্ষের এ রেকর্ড কেবল একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক মডেলের পরিবর্তনের প্রতীক। আগামীর দিনগুলোয় ডিজনির সাম্রাজ্য কেবল রূপালি পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা থিম পার্কের রাইড ও পর্যটকদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরো

বিস্তৃত হবে। —সিএনবিসি অবলম্বনে

আরও